প্রগতি বার্তা

নেতৃত্বের প্রশ্নে জামায়াতে ভাঙন?

এটিএম আজহার ইস্যুতে আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও নীরবতার রাজনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিকাল ৬:০৪
এটিএম আজহার ইস্যুতে আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও নীরবতার রাজনীতি

আপিল বিভাগের রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। তবে আদালতের রায়ের বাইরেও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলের ভেতরে তাঁর বর্তমান অবস্থান কী, নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কোন দিকে, এবং আদর্শিকভাবে জামায়াত কোন পথে দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটিএম আজহারকে সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্বে দেখতে চান দলের একটি বড় অংশ। তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান ও সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতরে ভেতরে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।


কে এই এটিএম আজহারুল ইসলাম

 এটিএম আজহারুল ইসলামের পূর্ণ নাম আবু তোরাব মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম। ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার বাতাসিওন গ্রামে তাঁর জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি। তিনি দৈনিক সংগ্রামের পরিচালকসহ বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

 

রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে রংপুর-২ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১২ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছর আপিল বিভাগ সেই দণ্ড বাতিল করে তাঁকে অভিযোগ থেকে খালাস দেন।


নেতৃত্বের দৌড়ে ছিলেন কি আজহার? 

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটিএম আজহার সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ, ত্যাগী এবং আদর্শিকভাবে দৃঢ় অবস্থানের নেতা। দলের একটি বড় অংশ তাঁকে ভবিষ্যৎ আমির হিসেবে ভাবছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে দলের শীর্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের প্রভাব বেড়েছে, যাদের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান ও চিন্তাধারা জামায়াতের ঐতিহ্যগত আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


আদর্শিক রূপান্তর না রাজনৈতিক কৌশল?

তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে, জামায়াতের ভেতরে এখন দুটি ধারা সক্রিয়। একটি অংশ মনে করে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে দলকে ভাষা ও কৌশলে কিছু পরিবর্তন আনতেই হচ্ছে।অন্য অংশের দাবি, এই পরিবর্তনের নামে দল তার মূল ইসলামপন্থী অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে।

 

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার এক স্থানীয় নেতা, মোল্লা ইসহাক মিয়া, একটি সভায় প্রকাশ্যে বর্তমান নেতৃত্বের কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কিছু নির্দেশনা নিয়ে তারা পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। তাঁর এ বক্তব্য দলীয় ভেতরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।  


সহিংসতা ও নীরবতা

সম্প্রতি শেরপুরে এক জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া না আসায় তৃণমূল পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন। একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বলেন,“এ ধরনের ঘটনায় নীরবতা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তারা জানতে চায়, দল কোন কৌশলে এগোচ্ছে।


প্রতীক পরিবর্তন ঘিরে বিতর্ক 

দলীয় প্রতীক, স্লোগান ও জনসমাবেশে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রচারসামগ্রীতে আগের ধর্মীয় প্রতীক ও ভাষার ব্যবহার কমে যাওয়ায় সমালোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “এটি আদর্শগত বিচ্যুতি, নাকি সময়োপযোগী কৌশলগত পুনর্গঠন—সেটি স্পষ্ট না হওয়ায় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে ।


এটিএম আজহার এখন কোথায়? 

এটিএম আজহার প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দলের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট নয়। দলের একটি অংশ এখনো মনে করে, আদর্শিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ছাড়া জামায়াত তার ঐতিহ্যগত অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।


সামনে কী? 

তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে আদর্শিক বিতর্ক এখন আর চাপা নেই। নেতৃত্বের প্রশ্ন, রাজনৈতিক কৌশল এবং দলীয় পরিচয়ের সংকট—সব মিলিয়ে দলটি এক সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। এই বিভাজন সাময়িক, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেবে—এবং এটিএম আজহার ভবিষ্যতে সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেবেন কি না—সেই প্রশ্নই এখন দলীয় অন্দরে ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ